গুলশানের এক অভিজাত রেস্তোরাঁ। সন্ধ্যা নামছে, কাঁচের জানালার বাইরে শহরের রঙিন আলো ঝলমল করছে। ভেতরে মৃদু আলো আর ভায়োলিনের সুর এক রোমান্টিক আবহাওয়া তৈরি করেছে। সায়ান ৩০ বছর বয়সী একজন সফল ইন্টেরিয়র ডিজাইনার। তার রুচি আর দক্ষতা তাকে অল্প বয়সেই খ্যাতি এনে দিয়েছে। সে আজ তার প্রথম বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করছে। তার স্ত্রী, ২৯ বছর বয়সী অহনা, একজন ফ্যাশন ডিজাইনার। তাদের ভালোবাসার গল্পটা যেন এক নিখুঁত আর্টওয়ার্ক।
অহনা রেশমী শাড়িতে অপরূপা লাগছে। তার চোখের চঞ্চলতা আর হাসি আজও সায়ানকে মুগ্ধ করে। সায়ান তার হাত ধরে। তাদের জীবনের এক বছর কেটে গেলো, অথচ মনে হচ্ছে যেন এইতো সেদিন তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল। সায়ান একটি লাল গোলাপ অহনার হাতে তুলে দেয়।
অহনা গোলাপটা নাকের কাছে নেয়, তার মুখে এক মিষ্টি হাসি। থ্যাঙ্ক ইউ, সায়ান। তুমি আজও আমাকে অবাক করে দাও।
তারা ডিনার শেষ করে। রেস্তোরাঁ থেকে বের হতে গিয়ে সায়ানের ফোন বেজে ওঠে। তার পুরোনো বন্ধু মাহিম, একজন পুলিশ অফিসার। মাহিমের গলাটা কেমন যেন বিচলিত শোনাচ্ছে। সায়ান কিছুটা দূরে গিয়ে কথা বলে।
মাহিম বললো, সায়ান, তোর সাহায্য দরকার। ইমার্জেন্সি।
সায়ান অবাক হয়। কী হয়েছে?
মাহিম চাপা গলায় বললো, একটা মার*ার কেস। খুব জটিল। তুই কিছু ইন্টেরিয়র ডিজাইন সংক্রান্ত ডেটা হ্যান্ডেল করতে পারিস। এটা আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখনই আসতে পারবি?
সায়ান ঘড়ি দেখলো। অহনা ওর দিকে তাকিয়ে আছে। সে মাহিমকে বললো, আমি আসছি। অহনার কাছে এসে সে বললো, ডার্লিং, মাহিমের একটা আর্জেন্ট কাজ। আমি এখনই আসছি। তুমি কি ড্রাইভারের সাথে বাড়ি ফিরতে পারবে?
অহনা প্রথমে একটু মন খারাপ করলেও পরে হেসে বললো, অফকোর্স। বাট ইউ প্রমিজ, কালকে সকালে আমরা ব্রঞ্চে যাবো।
সায়ান হেসে মাথা নাড়ে। প্রমিজ।
অহনা চলে গেলে সায়ান মাহিমের দেওয়া ঠিকানায় রওনা হয়। জায়গাটা শহরের এক পুরোনো প্রান্তে, যেখানে আধুনিকতার ছোঁয়া তেমনভাবে লাগেনি। একটা পরিত্যক্ত গুদামঘর। সায়ান পৌঁছতেই মাহিমকে দেখতে পায়। মাহিমের মুখে উদ্বেগ স্পষ্ট।
ভেতরে ঢুকেই সায়ান চমকে ওঠে। একটা জীর্ণ কক্ষ। মেঝেতে রক্তের ছোপ। একজন তরুণীর নিথর দেহ পড়ে আছে। সায়ান চোখ সরিয়ে নেয়।
মাহিম বললো, রিশা। ফ্রিল্যান্স গ্রাফিক ডিজাইনার। তার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে তুলে নিয়ে আসা হয়েছিল। এই ডেড বডির সাথে আমরা কিছুই পাইনি। কোনো ডকুমেন্টস নেই।
সায়ান হতবাক। এতো নৃশংস! কিন্তু আমাকে কেন ডেকেছিস? আমি তো ইনভেস্টিগেটর নই।
মাহিম একটি USB ড্রাইভ আর একটি ভাঁজ করা কাগজ সায়ানের হাতে দিলো। সে বললো, ওর অ্যাপার্টমেন্টে এক বন্ধুর কাছ থেকে এটা পেয়েছি। তুই যেহেতু ডিজাইন ডেটা নিয়ে কাজ করিস, তুই হয়তো এর ভেতরের ডেটা অ্যাক্সেস করতে পারবি। কাগজটায় কিছু একটা লেখা।
সায়ান USBটা পরীক্ষা করে। এটা একটা অদ্ভুত USB। মেটাল আর প্লাস্টিকের এক জটিল নকশা। ভাঁজ করা কাগজটায় কেবল তিনটে শব্দ লেখা ছিল: লাল গোলাপ গুপ্তচর এবং একটা stylized গোলাপের প্রতীক।
সায়ান বললো, লাল গোলাপ গুপ্তচর? এটা কি কোনো কোড?
মাহিম মাথা নাড়ে। জানি না। কিন্তু আমার মনে হয় এই USB আর ওই কোডের পেছনেই রহস্য লুকিয়ে আছে। এটা খুবই সেনসেটিভ ডেটা হতে পারে। রিশাকে এই কারণেই সম্ভবত মারা হয়েছে।
সায়ান USB ড্রাইভটি তার ল্যাপটপে সংযুক্ত করার চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। এটি এনক্রিপ্টেড। সায়ানের ভেতরে একটা অস্বস্তি কাজ করে। রিশা, একজন গ্রাফিক ডিজাইনার, কেন এমন ডেটা নিয়ে কাজ করছিলো?
মাহিম বললো, আমরা তার প্রেমিককে খুঁজে পেয়েছি। অর্ক নামের এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। সে দাবি করছে, রিশাকে কিছু লোক তুলে নিয়ে গিয়েছিল। সে ভয় পেয়ে লুকিয়ে ছিল। আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছি।
সায়ান ইউএসবি আর কাগজ নিয়ে বাড়ি ফেরে। অহনা তখন ঘুমিয়ে। সায়ান তার স্টাডিতে বসে। মন দিয়ে কাগজটা আর ইউএসবিটা দেখে। লাল গোলাপ গুপ্তচর। বারবার শব্দগুলো আওড়ায়। সে তার নিজের কিছু বিশেষ সফটওয়্যার দিয়ে USB ড্রাইভটি ডিক্রিপ্ট করার চেষ্টা করে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়। শেষ পর্যন্ত তার চেষ্টা সফল হয়।
USB ড্রাইভের ভেতরে থাকা ফোল্ডারগুলো দেখে সায়ান অবাক হয়ে যায়। ভেতরে শুধু গ্রাফিক ডিজাইন নয়, আছে কিছু ডকুমেন্ট আর এনক্রিপ্টেড ভিডিও ফাইল। সব ফাইল ‘প্রজেক্ট অরোরা’ নামে সেভ করা। সায়ান দ্রুততম সময়ে ফাইলগুলো দেখে। প্রজেক্ট অরোরা একটি গোপন ডেটা মাইনিং প্রকল্প। একটি শক্তিশালী সংস্থা এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ডেটা চুরি করে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক তথ্য থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত গোপন তথ্য পর্যন্ত। রিশা এই প্রকল্পের তথ্য ফাঁসের চেষ্টা করছিলো। তার ডেটাগুলো ছিল এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রমাণ।
ভিডিও ফাইলগুলো খুলতেই সায়ান চমকে ওঠে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রিশা তার ফোনের ক্যামেরা দিয়ে একটি গোপন মিটিংয়ের ভিডিও করছে। মিটিংয়ে কিছু উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা আর একটি বিদেশী সংস্থার এজেন্ট উপস্থিত। তাদের মুখে চাপা হাসি, তারা দেশবিরোধী এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করছে। হঠাৎ একটি পরিচিত মুখ দেখে সায়ান স্তব্ধ হয়ে যায়। তার স্ত্রী অহনার বাবা, জনাব রহমান। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। ভিডিওতে তাকে ওই বিদেশী এজেন্টের সাথে করমর্দন করতে দেখা যায়। তাদের চোখমুখে সন্তুষ্টি।
সায়ানের হাত থেকে USB ড্রাইভটা পড়ে যায়। তার পৃথিবীটা যেন মুহূর্তে ভেঙে পড়ে। অহনার বাবা? এটা কীভাবে সম্ভব? সে বিশ্বাস করতে পারে না। তার মনের মধ্যে এক অস্থিরতা। তার স্ত্রীর পরিবার। তার নিজের ভালোবাসার মানুষ। কিভাবে তারা এমন এক জঘন্য কাজের সাথে জড়িত হতে পারে? লাল গোলাপ গুপ্তচর এই কোডটার মানে কী?
সে কাগজটা আবার দেখে। লাল গোলাপ গুপ্তচর। তার মনে পড়ে তার আর অহনার প্রথম দেখা হয়েছিল একটা ফুলের দোকানে। অহনা তখন একটি লাল গোলাপ বেছে নিচ্ছিলো। তার মনে পড়ে তাদের বিবাহবার্ষিকীতেও সে অহনাকে লাল গোলাপ দিয়েছে। এসব কি কেবল কাকতালীয়?
তার ফোন বেজে ওঠে। মাহিম।
সায়ান ফোন ধরে। মাহিম বললো, অর্ক নামের সেই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার পালিয়ে গেছে। আমরা ওকে খুঁজে পাচ্ছি না। সে হয়তো কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে পালিয়েছে।
সায়ানের মন আরও বিচলিত হয়। অর্ক কি জানতো এসব? সে রিশার সাথে কী সম্পর্ক রাখতো?
পরের দিন সকালে। সায়ান রাতের ঘুমহীন চোখ নিয়ে অহনার দিকে তাকায়। অহনা তার জন্য কফি বানিয়ে এনেছে। হাসিমুখে তার পাশে এসে বসে।
অহনা বললো, কী হলো? এতো চুপচাপ কেন?
সায়ান অহনার চোখে চোখ রাখে। তার ভেতরটা কাঁপে। সে জানে না কীভাবে এই সত্যটা মোকাবিলা করবে। তার সামনে দুটো পথ খোলা। হয় সে এই সত্যকে লুকিয়ে রাখবে, অথবা তার নিজের স্ত্রীকে বিপদে ফেলবে। সে জানে না কোনটা সঠিক পথ। এই প্রজেক্ট অরোরা শুধু একটি ডেটা চুরির প্রকল্প নয়, এটি তার জীবন, তার সম্পর্ককে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
সায়ান কফির মগটা হাতে নিলো। কাপের উষ্ণতা তার হাতে, কিন্তু তার ভেতরটা শীতল। অহনার হাসির পেছনে কি কোনো কালো ছায়া লুকিয়ে আছে? লাল গোলাপ গুপ্তচর। এই নামটা কি তার ভালোবাসার এক প্রতীক নাকি এক ভয়ঙ্কর বিপদের ইঙ্গিত? সায়ান বুঝতে পারছিলো, এই গল্পের রোমান্স শেষ হয়ে যায়নি। বরং, এর সাথে মিশে গেছে এক চরম থ্রিলারের ঘনঘটা।