এক ঝুম বৃষ্টি নামলো ঢাকার বুকে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হচ্ছে আর গুলশানের কোণার এই ক্যাফেটায় ভিড় বাড়ছে। কাঁচের জানালায় বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে আর ভেতরের উষ্ণ আমেজ আরও আরামদায়ক লাগছে। শায়ান ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে কিবোর্ডে আঙুল চালাচ্ছিলো। নতুন একটা কোডিং প্রজেক্ট ওর মাথা ঘুরিয়ে দিচ্ছিলো। কফির মগটা ওর হাতের কাছেই ছিলো।
হঠাৎ করেই এক মৃদু ধাক্কা। গরম কফি শায়ানের ল্যাপটপ আর ওর সাদা শার্টের কিছুটা ভিজিয়ে দিলো। শায়ান চমকে তাকালো। সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন তরুণী। ওর চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেছে, মুখে একরাশ অপরাধবোধ।
আমি স্যরি স্যরি! সে বললো। সে দ্রুত একটা টিস্যু বক্স বাড়িয়ে দিলো।
শায়ান একটু হেসে বললো, ইটস ওকে। ল্যাপটপটা হয়তো বেঁচে যাবে। শার্টের কিছু যায় আসে না।
মেয়েটি একটু হাসলো। মিষ্টি হাসি। ওর নাম রিনা। সে বললো, আমি রিনা। খুব ব্যস্ত ছিলাম, তাই খেয়াল করিনি।
শায়ান বললো, শায়ান। ব্যস্ততা কি কোডিংয়ের মতো জটিল কিছু?
রিনা হেসে বললো, গ্রাফিক ডিজাইনিং। আপনার কফিটা নষ্ট করলাম, আমাকে একটা কফি বানাতে দিন।
শায়ান প্রথমে মানা করলো কিন্তু রিনা জোর করলো। ওরা নতুন কফি নিয়ে আবার বসলো। কথার শুরুটা হয়েছিলো কফি আর কোডিং দিয়ে কিন্তু দ্রুতই ওদের কথা আরও গভীর হলো। হাসিঠাট্টা চললো। বৃষ্টি থামলে ওরা ক্যাফে থেকে বের হলো। শায়ান রিনার ফোন নাম্বার চাইলো আর রিনা এক সেকেন্ডও না ভেবে নাম্বারটা দিলো। ওদের মন বলছিল, এ শুধু কফি নয়, এর চেয়েও গভীর কিছু শুরু হচ্ছে।
পরের কয়েকটা দিন ওদের কাটলো মেঘ আর রোদের গল্পে। ওরা একবার রিকশায় চড়ে সারা শহর ঘুরে বেড়ালো একবার লালবাগ কেল্লায় নিরিবিলি সময় কাটালো। শায়ান মুগ্ধ হচ্ছিলো রিনার বুদ্ধিমত্তা আর প্রাণবন্ত হাসিতে। রিনা ভালো লাগছিলো শায়ানের সহজ সরল আচরণ আর ওর গভীর ভাবনাগুলো। রোম্যান্সের নতুন এক ঢেউ দুজনকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো।
একদিন সন্ধ্যায় ওরা বেইলি রোডের এক রেস্টুরেন্টে ডিনার করছিলো। রেস্টুরেন্টটা বেশ নিরিবিলি ছিলো। হঠাৎ রিনার ফোন বেজে উঠলো। ও ফোনটা হাতে নিলো কিন্তু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ওর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। ওর হাত কাঁপতে শুরু করলো। শায়ান লক্ষ্য করলো ওর চোখ দুটো ভয় আর উদ্বেগে ভরে আছে।
রিনা কথা বলার জন্য রেস্টুরেন্টের এক কোণে চলে গেলো। শায়ান ওকে দেখছিলো। রিনা ফিসফিস করে কথা বলছিল, খুব দ্রুত। ওর ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিলো সে কাউকে শান্ত করার চেষ্টা করছে অথবা নিজেই আতঙ্কিত। কিছুক্ষণ পর রিনা ফিরে এলো।
শায়ান বললো, কি হয়েছে? তুমি ঠিক আছো?
রিনা জোর করে হাসার চেষ্টা করলো। না মানে হ্যাঁ, ঠিক আছি। একটা জরুরি ক্লায়েন্টের ফোন। কাজটা এক্ষুনি শেষ করতে হবে। আমাকে এখনই যেতে হবে শায়ান।
শায়ান অবাক হলো। এতো রাতে?
রিনা মাথা ঝাঁকালো। হ্যাঁ, এক্সট্রিমলি ইম্পর্ট্যান্ট। আমি তোমাকে পরে ফোন করছি। সে দ্রুত বিল মিটিয়ে রেস্টুরেন্টের বাইরে বেরিয়ে গেলো।
শায়ান দেখলো রিনা গাড়িতে ওঠার সময় ওর ব্যাগ থেকে কিছু একটা পড়ে গেলো। একটা ছোট ইউএসবি ড্রাইভ। শায়ান দ্রুত ওটা কুড়িয়ে নিলো। রিনার গাড়ি ততক্ষণে চলে গেছে। শায়ান ইউএসবিটা হাতে নিয়ে দেখলো, এটা সাধারণ কোনো ইউএসবি নয়। এর ডিজাইনটা বেশ অদ্ভুত, যেন মেটাল আর প্লাস্টিকের এক জটিল নকশা। শায়ান ভাবলো সে রিনাকে ফোন করে জানাবে।
সে ফোন বের করতেই দেখলো রিনার গাড়িটা রাস্তার মোড়ে থেমেছে। একটি কালো রঙের সেডান কার রিনার গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো। কালো গাড়ির কাঁচ নামলো। ভেতরে দুই জন লোক। তাদের মুখ বোঝা যাচ্ছিলো না। রিনা তার গাড়ির ড্রাইভারের সাথে কিছু কথা বলছিলো। শায়ানের কেমন যেন সন্দেহ হলো।
রিনা তখন তার গাড়ি থেকে নেমে কালো গাড়ির দিকে যাচ্ছিলো। শায়ান দেখলো রিনার মুখটা আরও ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। তার হাঁটাচলায় একটা দ্বিধা। কালো গাড়ির দিকে যেতেই একজন লোক গাড়ি থেকে নেমে রিনাকে প্রায় টেনে গাড়িতে ওঠালো। শায়ানের হার্টবিট বেড়ে গেলো। এটা স্বাভাবিক কিছু নয়। এটা কোনো ক্লায়েন্টের মিটিং হতে পারে না।
শায়ান দ্রুত একটা রিকশা ডেকে উঠলো। রিকশাচালককে বললো কালো গাড়িটার পিছু নিতে।
রিকশাচালক বললো, ভাই, এটা তো প্রাইভেট কার। রিকশায় কি পারা যাবে?
শায়ান বললো, চেষ্টা করুন। প্লিজ!
কালো গাড়িটা দ্রুত গতিতে এগোচ্ছিলো। শায়ানের রিকশাও সাধ্যমতো চেষ্টা করছিলো। শহরের রাস্তায় জ্যামের কারণে মাঝে মাঝে কালো গাড়িটা আটকে যাচ্ছিলো আর শায়ান রিকশা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলো। রিনা নিশ্চয়ই বিপদে আছে। ওর চোখে যে ভয় দেখেছিলাম, সেটা এখন স্পষ্ট মনে পড়ছিলো। শায়ান ইউএসবিটা শক্ত করে ধরলো। এর মধ্যে কী আছে?
গাড়িটা একটি পুরনো এলাকার দিকে মোড় নিলো। অন্ধকার রাস্তা। অল্প কিছু স্ট্রিট লাইট জ্বলছিলো। শায়ান রিকশাচালককে সাবধানে যেতে বললো। কালো গাড়িটা একটা পরিত্যক্ত ওয়্যারহাউসের সামনে থামলো। জায়গাটা সুনসান। রিকশাচালক বললো, ভাই, এর বেশি আমি যাবো না। জায়গাটা সুবিধার না।
শায়ান রিকশা থেকে নেমে গেলো। রিকশাচালক ভাড়া নিতে নিতেই দ্রুত রিকশা ঘুরিয়ে চলে গেলো। শায়ান একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে ওয়্যারহাউসের দিকে তাকালো। কালো গাড়ি থেকে রিনাকে টেনে বের করা হলো। ওর মুখটা এখন সম্পূর্ণ ভয়ে সাদা। দুইজন লোক ওকে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে। শায়ানের বুক দুরু দুরু করছিলো। সে রিনাকে বাঁচাতে চায়। কিন্তু কিভাবে?
শায়ান সাবধানে ওয়্যারহাউসের পেছনের দিকে গেলো। একটা ছোট ভাঙা জানালা দেখতে পেলো। ওখান থেকে ভেতরে তাকানোর চেষ্টা করলো। ভেতরে আলো খুব কম। একটা টেবিলের ওপর একটা ল্যাম্প জ্বলছে। রিনাকে চেয়ারে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার সামনে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখটা স্পষ্ট নয় কিন্তু তার গলার আওয়াজ শুনতে পেলো শায়ান।
কোথায় রেখেছিস ডেটা? লোকটি বললো।
রিনা কাঁপা গলায় বললো, আমি জানি না কিসের কথা বলছেন।
মিথ্যে বলিস না রিনা। তুই জানিস। প্রজেক্ট অরোরা। ওই ডেটা আমাদের চাই। লোকটি রিনার দিকে এক পা এগিয়ে গেলো।
প্রজেক্ট অরোরা? শায়ানের মাথায় নামটা ঘুরতে লাগলো। এটা কি? এই ইউএসবিটা কি সেটারই অংশ?
শায়ান আর অপেক্ষা করতে পারলো না। রিনার জীবন বিপদে। সে পকেট থেকে ফোন বের করলো। পুলিশকে ফোন করার কথা ভাবলো কিন্তু ওদের কাছে পৌঁছানোর আগেই রিনার হয়তো কিছু হয়ে যাবে। শায়ান একটা ইট কুড়িয়ে নিলো। ওয়্যারহাউসের প্রধান দরজার দিকে দৌড়ালো।
দরজাটা পুরনো কিন্তু তালা লাগানো। শায়ান ইট দিয়ে দরজার পাশে থাকা একটা ভাঙা কাঁচের টুকরা সরালো। তারপর তালাটার দিকে তাকালো। এই তালা ভাঙা সহজ নয়।
ভেতরে লোকটার গলা আরও চড়া হলো। রিনাকে হুমকি দিচ্ছিলো। শায়ান মরিয়া হয়ে দরজায় ধাক্কা মারলো। একটা পুরনো কাঠের গুঁড়ি দেখতে পেলো কাছেই। ওটা দিয়ে দরজার ওপর আঘাত করলো।
ভেতরে একজন লোক চিৎকার করে উঠলো, বাইরে কে?
শায়ান তখন দ্বিতীয়বারের মতো দরজায় আঘাত করলো। দরজাটা চিড় ধরলো।
ভেতর থেকে লোক দুটো দ্রুত রিনার বাঁধন আলগা করলো। তারা বন্দুক তাক করে দরজার দিকে এগোচ্ছিলো। শায়ান বুঝতে পারলো তার কাছে সময় খুব কম। তৃতীয় আঘাতটা করলো সে। দরজাটা খুলে গেলো।
শায়ান ভেতরে ঢুকতেই দেখলো দুইজন লোক বন্দুক তাক করে আছে। রিনা ভয়ে চুপসে আছে। শায়ান কিছু না ভেবেই হাতের ইউএসবিটা লোকটির দিকে ছুঁড়ে মারলো। ইউএসবিটা দ্রুত গতিতে লোকটির মুখের ওপর আঘাত করলো। লোকটি টাল সামলাতে না পেরে পিছিয়ে গেলো।
শায়ান রিনার দিকে দৌড়ালো। রিনার বাঁধন সম্পূর্ণ আলগা হয়নি। শায়ান ওর হাত ধরে টান দিলো।
দ্রুত পালাও! শায়ান বললো।
ওরা ওয়্যারহাউসের পেছনের দিকের ছোট জানালাটার দিকে দৌড়ালো। বন্দুকের আওয়াজ হলো। শায়ান রিনাকে ধাক্কা দিয়ে বললো, নিচু হও!
রিনা উইন্ডো দিয়ে বের হতে চাইলো। উইন্ডোটা ছোট ছিল। শায়ান ওকে বের হতে সাহায্য করলো। শায়ান যখন নিজে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলো তখন তার কাঁধে একটা গুলি লাগলো। একটা তীব্র ব্যথা অনুভব করলো সে।
শায়ান দাঁত চেপে বাইরে এলো। রিনা পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলো। শায়ান ওকে টেনে নিয়ে দৌড়াতে শুরু করলো। অন্ধকার গলিপথ ধরে ওরা দৌড়াচ্ছিলো। পেছনে ধাওয়া করার শব্দ পাচ্ছিলো।
একটা নির্জন রাস্তার মোড়ে এসে ওরা থামলো। শায়ানের কাঁধ থেকে রক্ত ঝরছে। রিনা ভয় আর উদ্বেগে কাঁপছে।
শায়ান হাফাতে হাফাতে বললো, তুমি ঠিক আছো?
রিনা কেঁদে বললো, শায়ান, তোমার কি হয়েছে?
শায়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এটা আসলে কী রিনা? কিসের প্রজেক্ট অরোরা? তুমি এতো ডেঞ্জারাস কিছুতে জড়িয়ে গেছো কেন?
রিনা চোখ মুছে শায়ানের দিকে তাকালো। তার চোখে এখন ভয় আর কৃতজ্ঞতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। সে বললো, শায়ান, আমি জানি না তুমি কেন এমন করলে কিন্তু তুমি আমার জীবন বাঁচালে। এই প্রজেক্ট অরোরা এমন কিছু যা আমাদের দেশের সিকিউরিটিকে হুমকির মুখে ফেলছে। আর ওই ইউএসবিতে এমন তথ্য আছে যা ওরা খুঁজছে।
শায়ান ইউএসবিটার কথা ভুলে গিয়েছিলো। সে বললো, ইউএসবিটা তো আমি ছুঁড়ে মেরেছিলাম।
রিনা মাথা নাড়লো। না, সেটা আসলটা ছিল না। আসলটা আমার কাছে আছে। সে ওর পোশাকের ভেতর থেকে একটি ছোট ইউএসবি বের করলো।
শায়ান অবাক হলো। তাহলে যে ইউএসবিটা আমি ছুঁড়ে মেরেছিলাম সেটা কি?
রিনা বললো, ডামি। আমি সব সময় আসল ডেটার সাথে একটি ডামি রাখি।
শায়ান বুঝতে পারলো রিনা কতটা সাবধানে থাকে। কিন্তু এই মুহূর্তে ওদের সামনে নতুন এক বিপদ। শায়ান রিনাকে দেখলো, তার মুখে লেগে আছে ধুলো আর ভয়। কিন্তু তার চোখে একটা দৃঢ়তা। শায়ানের মনে হলো সে রিনাকে হারাবে না। সে তার পাশে থাকবে। কিন্তু এর পরিণাম কী হবে সে জানে না। ঢাকা শহরের এই রাতের অন্ধকারে এক রোম্যান্টিক গল্পের সাথে মিশে গেলো এক থ্রিলারের চরম বাস্তবতা। শায়ানের কাঁধের ব্যথাটা যেন এই নতুন জার্নির পূর্বাভাস দিচ্ছিলো।