গুলশানের কোলাহলপূর্ণ কফি শপ। বাইরে রোদের তীব্রতা বাড়ছে। ভেতরের ঠাণ্ডা আবহাওয়া আর কফির মায়াবী গন্ধ মনকে শান্ত করে। অর্ক তার ল্যাপটপে ডুবে আছে। ২৮ বছর বয়সী এই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার কোডের গভীরে একরকম শান্তি খুঁজে পায়। তার নতুন প্রজেক্টের ডেডলাইন কাছে আসছে। দ্রুত হাতে কিবোর্ডে টাইপ করে সে।
এক কাপ কফি শেষ করে অর্ক নতুন করে অর্ডার দিতে কাউন্টারে যায়। ফিরতি পথে তার অসাবধানতায় ঘটনাটা ঘটে। এক ঝলমলে সাদা কুর্তি পরা মেয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলো। অর্ক ঘুরতেই ধাক্কা খায়। গরম কফি তার হাতে ধরা মগ থেকে ছিটকে গিয়ে মেয়েটির সাদা কুর্তিতে লাগে। একটা গভীর বাদামী দাগ মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে।
অর্ক স্তম্ভিত। সরি, সরি! এক্সট্রিমলি সরি! সে দ্রুত তোয়ালে খুঁজতে থাকে।
মেয়েটি প্রথমে চমকে ওঠে। তার মুখে বিরক্তি দেখা যায়, কিন্তু পরের মুহূর্তেই তা মিলিয়ে যায় এক অদ্ভুত হাসিতে। ইটস ওকে। কোনো ব্যাপার না। হাসির সাথে তার চোখ দুটো চিকচিক করে ওঠে।
অর্ক মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। তার হাসিটা যেন এই কোলাহলপূর্ণ ক্যাফের সব শব্দকে ছাপিয়ে যায়। সে তার নাম জানতে চায়। রিশা, মেয়েটি উত্তর দেয়। অর্ক নিজের নাম বলে। তাদের মধ্যে একটা হালকা কথোপকথন শুরু হয়। রিশা জানায় সে ফ্রিল্যান্স গ্রাফিক ডিজাইনার। তারা দ্রুত ফোন নম্বর বিনিময় করে। অর্কের মনে হয়, এই কফি স্পিলিং তার জীবনে একটা নতুন chapter খুলে দিলো।
পরের কয়েকটা দিন দ্রুত কেটে যায়। অর্ক আর রিশা নিয়মিত দেখা করে। তাদের ডেটিং শুরু হয়। রিকশায় চড়ে পুরোনো ঢাকার সরু গলিগুলোতে ঘুরে বেড়ানো, বিকেলে হাতিরঝিলের পাড়ে সূর্যাস্ত দেখা, বা রমনা পার্কের শান্ত পরিবেশে হাত ধরে হাঁটা। রিশার বুদ্ধিদীপ্ত কথা আর চঞ্চলতা অর্ককে মুগ্ধ করে। রিশা ছিল মিষ্টি স্বভাবের, সহজ সরল কিন্তু তার মধ্যে একটা রহস্যময়তা অর্ক প্রায়শই খুঁজে পেতো। কখনও সে গভীর চিন্তায় ডুবে যেত, অর্কের কথায় সাড়া দিতে দেরি করতো। অর্ক এসবকে তার আর্টিস্টিক সত্তার অংশ বলে ধরে নিত।
কিন্তু অর্ক ধীরে ধীরে কিছু অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করা শুরু করে। রিশার ফোন প্রায়ই আননোন নাম্বার থেকে বাজে। সে দ্রুত ফোনটা দেখে আর ফোন রিসিভ না করেই রেখে দেয়। তার চোখে মুখে একটা অজানা টেনশন ফুটে ওঠে। একবার সে শেষ মুহূর্তে একটা ডেট বাতিল করলো, কারণ হিসেবে বললো জরুরি ব্যক্তিগত কাজ। অর্ক একবার রিশার অ্যাপার্টমেন্টের কাছে একটা কালো টয়োটা অ্যালিয়ন গাড়ি সন্দেহজনকভাবে পার্ক করা দেখে। টানা কয়েকদিন গাড়িটা সেখানেই ছিল। অর্ক রিশাকে জিজ্ঞাসা করলে সে বিষয়টা হেসে উড়িয়ে দেয়।
একদিন সন্ধ্যায় রিশার ফোন আসে। তার গলায় একটা কাঁপা কাঁপা স্বর। অর্ক, আমার একটু দূরে যেতে হবে। কিছুদিনের জন্য। তুমি চিন্তা করো না। সে হুট করে ফোন কেটে দেয়। অর্ক দ্রুত কল ব্যাক করে, কিন্তু রিশা ফোন ধরে না। অর্ক তার অ্যাপার্টমেন্টে যায়। কলিং বেল বাজায়, দরজায় আঘাত করে, কিন্তু কোনো সাড়া পায় না। তার ভেতরে একটা অজানা আতঙ্ক দানা বাঁধতে শুরু করে।
তিন দিন পর রিশা অর্ককে একটা মেসেজ পাঠায়। একটা নিরিবিলি পার্কে দেখা করতে বলে। অর্ক যখন রিশার সাথে দেখা করে, সে দেখতে পায় রিশা ফ্যাকাশে আর ক্লান্ত। রিশা ক্ষমা চায়, বলে কিছু ব্যক্তিগত সমস্যা ছিল। অর্ক নরম করে জিজ্ঞাসা করে, কী ধরনের সমস্যা রিশা? রিশা আতঙ্কিত চোখে চারপাশে তাকায়। সে ফিসফিস করে বলে, কিছু লোক। খারাপ লোক। অর্ক অবাক হয়। কারা? কেন? রিশা তার চোখ সরিয়ে নেয়। সে বলে, আমি তোমাকে সব বলতে পারবো না। এটা খুব ডেঞ্জারাস। অর্ক জেদ ধরে, আমি হেল্প করতে চাই। আমাকে বুঝতে দাও। রিশা অনিচ্ছাকৃতভাবে রাজি হয়। সে বলে, আজ সন্ধ্যায় আমার অ্যাপার্টমেন্টে এসো।
রিশার অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকেই অর্ক বুঝতে পারে পরিস্থিতি নরমাল নেই। ছোট, ছিমছাম অ্যাপার্টমেন্টটা আজ ভয়ের নীরবতায় ডুবে আছে। রিশা অস্থিরভাবে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে।
অবশেষে রিশা বলতে শুরু করে। আমি একটা কিছুর পেছনে লেগেছিলাম। একটা কোম্পানি, তারা ডেটা নিয়ে অবৈধ কাজ করছে। আমার কাছে তার প্রুফ আছে। তার কথা শেষ না হতেই দরজার বাইরে থেকে একটা বিকট শব্দ আসে। অ্যাপার্টমেন্টের দরজা কাঁপতে শুরু করে। কেউ জোর করে দরজা খোলার চেষ্টা করছে।
রিশার চোখ আতঙ্কে বড় হয়ে যায়। সে অর্কের হাত ধরে টেনে বলে, লুকাও! এক্ষুনি! সে একটা ছোট ক্লোসেটের দিকে আঙুল দিয়ে দেখায়। অর্ক দ্রুত ক্লোসেটের ভেতরে ঢুকে পড়ে। সে ক্লোসেটের ফাঁক দিয়ে দেখতে পায় রিশা দ্রুতগতিতে একটা বুকশেলফের দিকে যাচ্ছে। সে একটা বই টেনে বের করে। বইটার পেছনে একটা গোপন কম্পার্টমেন্ট দেখা যায়। সেখান থেকে রিশা একটা ছোট, এনক্রিপ্টেড USB ড্রাইভ আর একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে।
রিশা কিছু করার আগেই দরজাটা প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে যায়। দুটো বিশালদেহী লোক কালো স্যুটে ভেতরে প্রবেশ করে। তারা যেন নিছকই মানুষ নয়, দুটো অন্ধকার শক্তি।
অর্ক ক্লোসেটের ভেতর থেকে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে সব দেখে। রিশা কোণঠাসা হয়ে আছে। একজন লোক রিশার হাত ধরে টেনে ধরে। রিশা আশ্চর্যজনক শক্তি দিয়ে USB ড্রাইভ আর কাগজটা জানালার পাশের একটা টবে রাখা গাছের মাটির ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। তারপর সে চিৎকার করে ওঠে।
লোক দুটো রিশাকে কাবু করে ফেলে। তাদের মধ্যে একজন টবের দিকে তাকায়। সে ধীরে ধীরে টবের দিকে এগিয়ে যায়। রিশা ধস্তাধস্তি করতে করতে চিৎকার করে ওঠে, তাদের এটা নিতে দিও না, অর্ক! তাদের জিততে দিও না!
টবের কাছে গিয়ে লোকটা দ্রুত খোঁজাখুঁজি করে, কিন্তু তাৎক্ষণিক কিছু পায় না। সে চারপাশে তাকায়। অর্ক বুঝতে পারে রিশা USB ড্রাইভ আর কাগজটা মাটির গভীরে লুকিয়ে রেখেছে। তাকে এটা উদ্ধার করতেই হবে।
লোক দুটো রিশাকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যায়। অ্যাপার্টমেন্টের দরজাটা সশব্দে বন্ধ হয়ে যায়।
অর্ক ধীরে ধীরে ক্লোসেট থেকে বেরিয়ে আসে। তার হাত পা কাঁপছে। সে দ্রুত টবের কাছে যায়। মাটি খুঁড়ে USB ড্রাইভ আর ভাঁজ করা কাগজটা বের করে। কাগজটায় কেবল তিনটে শব্দ লেখা ছিল: লাল গোলাপ গুপ্তচর এবং একটা stylized গোলাপের প্রতীক। অর্ক জানে না এই লাল গোলাপ গুপ্তচর মানে কী, কিন্তু তার ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি জাগে। এটা শুধু রিশার গল্প নয়, আরও বড় কিছুর শুরু মাত্র।