রিনা তার ছোট অ্যাপার্টমেন্টে একা থাকে। ঢাকার কোলাহলে মিশে থাকা সেই অ্যাপার্টমেন্ট তার সব থেকে প্রিয়। জানালার পাশে রাখা টেবিলটি তার লেখার একমাত্র আশ্রয়। সেখানে প্রতিদিন সকালে কফির উষ্ণ বাষ্প ওঠে কাগজের উপর কলমের খসখস শব্দ হয়। রিনা একজন লেখিকা স্বপ্ন নিয়ে খেলা করা তার পেশা। তার প্রতিটি গল্পের চরিত্ররা তার সাথে কথা বলে। ঘরজুড়ে ছড়ানো বই তার জীবন। পুরনো ম্যাগাজিন কাপড়ের স্তূপ রং-তুলি সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য তার ঘরে। সে গোছাতে একদমই পারে না কিন্তু তাতে তার কোনো দুঃখ নেই। এই এলোমেলো জীবনই তাকে আনন্দ দেয়।

একদিন সকালে রিনা তার প্রিয় কফি শপে গিয়েছিল। কফি হাউজ নামের এই জায়গাটি তার দ্বিতীয় বাড়ি। কাঠের আসবাব হালকা বাতি আর পুরনো দিনের গান মনকে শান্তি দেয়। রিনা তার পছন্দের ল্যাটে অর্ডার করল। হাতে গরম কফির কাপ নিয়ে সে একটা কোণার টেবিলে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার চোখ গেল সামনের দরজার দিকে। একজন লম্বা সুদর্শন পুরুষ ঢুকছে। তার পরনে একদম ইস্ত্রি করা শার্ট আর প্যান্ট। তার চেহারা গম্ভীর চোখে চশমা। রিনা মুগ্ধ হয়ে তাকে দেখছিল। সামনের দিকে খেয়াল ছিল না। ধাক্কা লাগল এক ওয়েটারের সাথে। মুহূর্তেই গরম কফি ছিটকে পড়ল সেই সুদর্শন পুরুষের সাদা শার্টে।

সাদা শার্টে গাড়ো বাদামী কফির দাগ স্পষ্ট হয়ে উঠল। লোকটি চোখ তুলে তাকালো রিনার দিকে। তার চোখে বিরক্তি ছিল না ছিল এক অদ্ভুত শান্ত চাহনি। রিনা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে বারবার স্যরি বলতে লাগল। তার হাত কাঁপছিল। লোকটি একটি টিস্যু নিয়ে শার্ট মোছার চেষ্টা করল। ঠিক আছে এমনটা হতেই পারে সে শান্তভাবে বলল। তার কণ্ঠস্বর ছিল গভীর। রিনা তখনও অস্বস্তিতে ভুগছিল। সে মনে মনে ভাবল ইস কি বোকামিটা করলাম!

সেই দিনটি রিনার মনে গেঁথে রইল। কফি হাউজের সেই সুদর্শন পুরুষের নাম ছিল অর্ণব। সে একজন স্থপতি। তার কাজে চরম শৃঙ্খলা তার জীবনেও। রিনা আর অর্ণব তারপর থেকে কফি হাউজে প্রায়ই দেখা করত। অর্ণব তার ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করত রিনা তার নোটবুক নিয়ে। তাদের মধ্যে প্রথম কয়েকবার কোনো কথা হয়নি। শুধু চোখে চোখ পড়লে হালকা হাসি বিনিময় হতো। রিনা তার গল্পে বুঁদ থাকত আর অর্ণব তার আঁকা নকশার মধ্যে ডুবে যেত।

একদিন রিনা তার গল্প লিখতে গিয়ে আটকে গেল। তার প্রধান চরিত্র কীভাবে একটি জটিল সমস্যা সমাধান করবে সে বুঝতে পারছিল না। মন খারাপ করে সে কফি হাউজে বসেছিল। অর্ণব পাশে বসেছিল। অর্ণব তার দিকে তাকিয়ে বলল কী হয়েছে কিছু সমস্যা? রিনা অবাক হলো অর্ণব তার সাথে কথা বলেছে। সে বলল হ্যাঁ আমার গল্পের চরিত্ররা এখন পথ হারা। অর্ণব আগ্রহ নিয়ে তার গল্পের কথা শুনল। সে কিছু যুক্তি দেখাল কিছু সমাধান প্রস্তাব করল। রিনা মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। তার চোখে আনন্দ ঝলমল করছিল। অর্ণব হাসল তার গম্ভীর মুখে এক ঝলক হাসি রিনাকে চমকে দিল। সেই দিন থেকে তাদের কথা বলা শুরু হলো। তাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বে মোড় নিল।

রিনা অর্ণবের গুছানো জীবন দেখে অবাক হতো। তার ঘরের প্রতিটি জিনিস যেন নিজের জায়গায় কথা বলে। অর্ণব আবার রিনার এলোমেলো ঘরে এসে শান্তি পেত। রিনার সৃষ্টিশীলতা তাকে মুগ্ধ করত। রিনা অর্ণবের সাথে বিভিন্ন প্রদর্শনীতে যেত আর্ট গ্যালারিতে যেত। অর্ণব রিনার গল্পের চরিত্রদের সম্পর্কে জানতে চাইত। তারা দুজন মিলে নতুন নতুন রেস্টুরেন্ট খুঁজে বের করত নতুন কফির স্বাদ নিত। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে একটি গভীর অনুভূতি জন্ম নিচ্ছিল।

একদিন রিনা তার নতুন উপন্যাস প্রকাশের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সে খুব উত্তেজিত ছিল কিন্তু তার মধ্যে একটি ভয়ও ছিল। অর্ণব তাকে সাহস জুগিয়েছিল। অর্ণব বলল তুমি পারবে রিনা। তোমার গল্পে অনেক জীবন আছে। রিনা সেই কথা শুনে অনেক শক্তি পেয়েছিল।

উপন্যাস প্রকাশের দিন একটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে রিনা তার বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করল। সেখানে অর্ণবও উপস্থিত ছিল। অর্ণবকে দেখে রিনা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল। রিনা মঞ্চে তার অনুভূতি বলছিল তার লেখার পেছনের গল্প বলছিল। সেই সময় তার চোখ বারবার অর্ণবের দিকে যাচ্ছিল। অর্ণবের চোখে সে গর্ব দেখছিল। অনুষ্ঠানের পর অনেক মানুষ রিনাকে অভিনন্দন জানাল। অর্ণবও এগিয়ে এল।

অর্ণব বলল তোমার গল্প মানুষকে ছুঁয়ে যাবে রিনা। আমি নিশ্চিত। রিনার হাত ধরে সে মৃদু চাপ দিল। সেই চাপ রিনার হৃদয়ে এক অন্যরকম অনুভূতি এনে দিল। রিনা বুঝতে পারছিল সে অর্ণবকে ভালোবেসে ফেলেছে।

কিন্তু তাদের মধ্যে একটি ছোট ভুল বোঝাবুঝি হলো। রিনার এক পুরনো বন্ধু রাহুল বিদেশে থেকে ফিরে আসল। রাহুলও একজন লেখক ছিল। তারা একসঙ্গে অনেক কাজ করেছে। রাহুল রিনার নতুন বইয়ের সফলতার জন্য একটি পার্টির আয়োজন করল। রাহুল রিনার খুব কাছের বন্ধু ছিল। অর্ণব রাহুলকে চিনত না। পার্টির দিন অর্ণব রিনাকে খুঁজতে এল। সে দেখল রাহুল রিনার হাত ধরে হাসছে। তাদের কথাবার্তা দেখে অর্ণবের মনে হলো তাদের মধ্যে কিছু একটা আছে। অর্ণবের মুখে হঠাৎ করে এক কালো মেঘ নেমে এল। সে কাউকে কিছু না বলে সেখান থেকে চলে গেল। রিনা অর্ণবকে চলে যেতে দেখল কিন্তু সে জানত না কেন অর্ণব হঠাৎ করে এমনটা করল।

পরের দিন সকালে রিনা অর্ণবকে ফোন করল। অর্ণব ফোন ধরল না। রিনা অর্ণবের অ্যাপার্টমেন্টে গেল। অর্ণব দরজা খুলল। তার চোখ ছিল ভারি তার মুখে কোনো হাসি ছিল না। রিনা প্রশ্ন করল কী হয়েছে অর্ণব? তুমি কাল অমন করে চলে গেলে কেন? অর্ণব গম্ভীরভাবে বলল কিছু না। রিনা বুঝতে পারল অর্ণব কিছু লুকোচ্ছে। অর্ণব রাহুল আর রিনার সম্পর্ক নিয়ে কিছু ভুল বুঝেছে। রিনা অর্ণবকে সবটা খুলে বলল। রাহুল শুধু তার বন্ধু আর তাদের মধ্যে কোনো প্রেম নেই। রিনা অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বলল অর্ণব আমি তোমাকে ভালোবাসি। অর্ণব অবাক হয়ে গেল। তার চোখে এক ঝলক আলো দেখা গেল।

অর্ণব রিনার দিকে তাকিয়ে হাসল। সে বলল আমিও তোমাকে ভালোবাসি রিনা। কিন্তু আমি খুবই বোকা। সে রিনার হাত ধরল। তারা দুজন একসঙ্গে হাসল। সেই দিন তারা কফি হাউজে গেল। সেই টেবিলের কোণে বসে তারা কফি খেল। তাদের জীবনের গল্প চলতে শুরু করল। অর্ণবের শৃঙ্খলিত জীবন রিনার এলোমেলো জীবনের সাথে মিশে গেল। তারা একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠল। কফির উষ্ণতা তাদের ভালোবাসাকে আরও গভীর করল। তাদের গল্প ছিল কফির মতো উষ্ণ আর মিষ্টি।